|
সূচনা কথা
ইংরেজী নামঃ Strawberry
বৈজ্ঞানিক নামঃ Fragaria ananasa
পরিবারঃ Rosaceae
স্ট্রবেরী একটি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। আকর্ষণীয় বর্ণ, গন্ধ ও উচ্চ
পুষ্টিমানের জন্য স্ট্রবেরী অত্যন্ত সমাদৃত। এটি একটি বহু বর্ষজীবি ফল
গাছ। ফল হিসেবে সরাসরি খাওয়া ছাড়াও বিভিন্ন খাদ্যের সৌন্দর্য ও সুগন্ধ
বৃদ্ধিতেও ইহা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অপেক্ষাকৃত স্বল্প খরচে এর চাষ করা
সম্ভব হলেও এটি বেশ উচ্চমূল্যে বিক্রয় হয় বিধায় এর চাষ খুবই লাভজনক। গুল্ম
জাতীয় এ ফলগাছটি খুব ছোট বিধায় টবে বাড়ির ছাদ বা বারান্দায় স্ট্রবেরী
উৎপাদন সম্ভব এবং আমাদের দেশে বর্তমানে এর প্রতি সকলের অন্যরকম একটি
আকর্ষন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
স্ট্রবেরীর জাত
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক
অবমুক্তায়িত জাত বারি স্ট্রবেরী-১, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রচলিত
জাত সমূহ রাবি-১, রাবি-২ এবং রাবি-৩ এবং মর্ডান হর্টিকালচার সেন্টার,
নাটোর কর্তৃক প্রচলিত জাত সমূহ মর্ডান স্ট্রবেরী-১, মর্ডান স্ট্রবেরী- ২,
মর্ডান স্ট্রবেরী- ৩, মর্ডান স্ট্রবেরী- ৪ (Camarosa), মর্ডান স্ট্রবেরী- ৫(Festival) আমাদের দেশে চাষযোগ্য জাত।
আমাদের দেশের উপযোগী জাত
বারি স্ট্রবেরী-১ বাংলাদেশের
সর্বত্র চাষোপযোগী অবমুক্তায়িত একটি উচ্চফলনশীল জাত। গাছের গড় উচ্চতা ৩০
সে.মি. এবং বিস্তার ৪৫-৫০ সে.মি.। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রোপণ করা
হলে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর থেকে
মার্চ পর্যন্ত ফল আহরণ করা যায়। গাছ প্রতি গড়ে ৩২ টি ফল হয়, যার মোট গড়
ওজন ৪৫০ গ্রাম। হেক্টর প্রতি ফলন ১০-১২ টন। হৃৎপিন্ডাকৃতির ফল ক্ষুদ্র
থেকে মধ্যম আকারের যার গড় ওজন (১৪ গ্রাম)। পাকা ফল আকর্ষণীয় টকটকে লাল
বর্ণের। ফলের ত্বক নরম ও ঈষৎ খসখসে। ফলের শতভাগ ভক্ষণযোগ্য। স্ট্রবেরীর
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সুগন্ধযুক্ত ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি (টিএসএস ১২%)। জাতটি
পর্যাপ্ত সরু লতা (Runner) ও চারা উৎপাদন করে বিধায় এর বংশবিস্তার সহজ।
উপযুক্ত পরিবেশ
স্ট্রবেরী মূলত মৃদু শীতপ্রধান অঞ্চলের
ফসল। গ্রীষ্মায়িত জাত কিছুটা উচ্চতাপ সহিষ্ণু। দিন ও রাতে যথাক্রমে ২০-২৬
ডিগ্রী সে: ও ১২-১৬ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রা গ্রীষ্মায়িত জাত সমূহের জন্য
প্রয়োজন। ফুল ও ফল আসার সময় শুষ্ক আবহাওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশের আবহাওয়ায়
রবি মৌসুম স্ট্রবেরী চাষের উপযোগী। বৃষ্টির পানি জমে না এ ধরনের
সুনিষ্কাশিত উর্বর দো-আঁশ থেকে বেলে-দোআঁশ মাটি স্ট্রবেরী চাষের জন্য
উত্তম।
চারা উৎপাদন
স্ট্রবেরী রানারের মাধামে বংশ বিস্তার করে থাকে।
তাই পূর্ববর্তী বছরের গাছ নষ্ট না করে জমি থেকে তুলে জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ
হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রোপণ করতে হবে। উক্ত গাছ হতে উৎপন্ন রানারের
পর্বসন্ধির নীচ থেকে যখন মূল বের হবে, তখন রানারটি মাতৃগাছ থেকে বিচ্ছিন্ন
করে ভালভাবে মিশানো গোবরমাটি (১:১) দিয়ে ভরা পলিথিন ব্যাগে (৪" x ৩")
লাগাতে হবে এবং তা হালকা ছায়াযুক্ত নার্সারীতে সংরক্ষণ করতে হবে। অতিরিক্ত
বৃষ্টি হ’তে রক্ষার জন্য বর্ষা মৌসুমে চারার উপর পলিথিনের ছাউনি দিতে হবে।
রানারের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা হলে স্ট্রবেরীর ফলন ক্ষমতা ধীরে ধীরে
হ্রাস পেতে থাকে। তাই ফলন ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য তিন বছর পরপর টিস্যু
কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারার রানার থেকে বংশ বিস্তার করা উত্তম।
জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণ
স্ট্রবেরী উৎপাদনের জন্য কয়েকবার চাষ
ও মই দিয়ে এবং আগাছা, বিশেষ করে বহু বর্ষজীবি আগাছা অপসারণ করে উত্তমরুপে
জমি তৈরি করতে হবে। চারা রোপণের জন্য বেড পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এ জন্য
১ মিটার প্রশস্ত এবং ১৫-২০ সে.মি. উঁচু বেড তৈরি করতে হবে। দুটি বেডের
মাঝে ৫০ সে.মি. নালা রাখতে হবে। প্রতি বেডে ৫০ সে.মি. দূরত্বে দুই সারিতে
৫০ সে.মি. দূরে দূরে চারা রোপণ করতে হবে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ভাদ্রের
মাঝামাঝি থেকে আশ্বিন মাস (সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য অক্টোবর) স্ট্রবেরীর চারা
রোপণের উপযুক্ত সময় ।
সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিঃ
গুনগত মানসম্পন্ন উচ্চফলন
পেতে হলে স্ট্রবেরীর জমিতে নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করতে হবে।
নিম্নের ছকে বিভিন্ন সারের হেক্টর প্রতি পরিমাণ দেখানো হলঃ
| সারের নাম |
পরিমাণ
|
সারের নাম
|
পরিমাণ
|
|
পঁচা গোবর
|
৩০ টন/হে.
|
এমপি
|
২২০ কেজি/হে.
|
|
ইউরিয়া
|
২৫০ কেজি/হে.
|
জিপসাম
|
১৫০ কেজি/হে.
|
|
টিএসপি
|
২০০ কেজি/হে.
|
জিংক সালফেট
|
২.৫ কেজি/হে.
|
শেষ
চাষের সময় সম্পূর্ণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও অর্ধেক পরিমাণ
এমপি সার জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও
অবশিষ্ট এমপি সার চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে ১৫-২০ দিন পরপর ৪-৫ কিস্তি
উপরি প্রয়োগ করতে হবে।
স্ট্রবেরী চাষে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়।
জমিতে রসের অভাব দেখা দিলে পর্যাপ্ত পানি সেচ দিতে হবে। স্ট্রবেরী
জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না। তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি
দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সরাসরি মাটির সংস্পর্শে এলে স্ট্রবেরীর ফল পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য চারা
রোপনের ২০-২৫ দিন পর স্ট্রবেরীর বেড খড় বা কাল পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
খড়ে যাতে উই পোকার আক্রমন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। জমি সবসময়
আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছের গোড়া হতে নিয়মিতভাবে রানার বের হয়, যা ফল
উৎপাদনের অন্তরায়। এজন্য উক্ত রানার সমূহ নিয়মিত কেটে ফেলতে হবে। রানার
কেটে না ফেললে গাছের ফুল ও ফল উৎপাদন বিলম্বিত হয় এবং হ্রাস পায়।
স্ট্রবেরীর রোগ ও প্রতিকার
পাতায় দাগপড়া রোগঃ
কোন কোন সময়, বিশেষত কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় পাতায় বাদামী রং এর দাগ
পরিলক্ষিত হয়। এ রোগের আক্রমন হলে ফলন এবং ফলের গুনগত মান হ্রাস পায়।
প্রতিকারঃ
রিডোমিল গোল্ড নামক ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০-১৫ দিন পরপর ২-৩ বার স্প্রে করে সুফল পাওয়া যায়।
ফল পঁচা রোগঃ
এ রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে জলে ভেজা বাদামী বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়।
প্রতিকারঃ
ফল পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে নোইন ৫০ ডব্লিউ পি অথবা ব্যাভিস্টিন ডিএফ নামক
ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পর পর
২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।
ভারটিসিলিয়াম উইল্টঃ
এ রোগে আক্রানত্গাছ হঠাৎ করে দূর্বল ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। আক্রমণ বেশী হলে
গাছ বাদামী বর্ণ ধারণ করে এবং মারা যায়। সাধারনতঃ জলাবদ্ধ জমিতে এ রোগের
আক্রমণ বেশী হয়।
প্রতিকারঃ
জমি শুষ্ক রাখতে হবে। পলিথিন মাল্চ ব্যবহার করলে তা তুলে ফেলতে হবে। কপার
জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন বর্দ্দোমিক্সার (১:১:১০), কুপ্রাভিট অথবা কপার
অক্সিক্লোরাইড প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৮-১০ দিন পর পর
২-৩ বার গাছের গোড়া ও মাটি ভালভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে।
পাখিঃ
বিশেষ করে বুলবুলি ও শালিক স্ট্রবেরী ফলের সবচেয়ে বড় শত্রু। ফল আসার পর সম্পূর্ণ পরিপক্ক হওয়ার পূর্বেই পাখির উপদ্রব শুরু হয়।
প্রতিকারঃ
ফুল আসার পর সম্পূর্ণ বেড জাল দ্বারা ঢেকে দিতে হবে যাতে পাখি ফল খেতে না পারে।
স্ট্রবেরীর গাছ প্রখর সৌর-তাপ এবং ভারী বর্ষণ সহ্য করতে পারেনা। এজন্য
মার্চ-এপ্রিল মাসে হালকা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নতুবা ফল আহরণের পর
মাতৃগাছ তুলে টবে রোপণ করে ছায়ায় রাখতে হবে। ফল আহরণ শেষ হওয়ার পর
সুস্থ্য-সবল গাছ তুলে পলিথিন ছাউনির নীচে রোপণ করলে মাতৃ গাছকে খরতাপ ও
ভারী বর্ষণের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যাবে। মাতৃ গাছ থেকে উৎপাদিত রানার
পরবর্তি সময়ে চারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে (সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে) রোপণকৃত বারি
স্ট্রবেরী-১ এর ফল সংগ্রহ পৌষ মাসে আরম্ভ হয়ে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত
(ডিসেম্বর থেকে মার্চ) চলে। ফল পেকে লাল বর্ণ ধারণ করলে ফল সংগ্রহ করতে
হয়। স্ট্রবেরীর সংরড়্ণ কাল খুবই কম বিধায় ফল সংগ্রহের পরপর তা টিস্যু
পেপার দিয়ে মুড়িয়ে প্লাসস্টিকের ঝুড়ি বা ডিমের ট্রেতে এমনভাবে সংরক্ষণ
করতে হবে যাতে ফল গাদাগাদি
অবস্থায় না থাকে। ফল সংগ্রহের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাজার জাত করতে হবে।
স্ট্রবেরীর সংরক্ষণ গুন ও পরিবহন সহিষ্ণুতা কম হওয়ায় বড় বড় শহরের কাছাকাছি
এর চাষ করা উত্তম।
তথ্যসূত্র : www.agrobangla.com
|