Skip to content
Default screen resolution  Wide screen resolution  Increase font size  Decrease font size  Default font size 
অবস্থান:    প্রথম পাতা arrow জীয়ন সংবাদ arrow ছানি অপারেশন
ছানি অপারেশন মুদ্রণ ইমেল

ছানি অপারেশন
কৃত্রিম লেন্সের দাম ও কার্যকারিতা


হালিমা খাতুন (ছদ্মনাম) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পঞ্চাশের ওপর বয়স। এ বয়সেই তাঁর চোখে ছানি পড়েছে। ফলে ঠিকমতো কাজকর্ম করতে পারেন না। তিনি জেনেছেন ছানি রোগের ভালো চিকিৎসা হচ্ছে আজকাল। আগের মতো আর অপারেশনের পর দুই দিন সটান শুইয়ে রাখা হয় না। এরপর মাস দেড়েক পর মোটা কাচের চশমা ব্যবহার করতেও হয় না। আগে হাজার পাওয়ারের ওপরে, ওই চশমা হারিয়ে গেলে নতুন চশমা না নেওয়া অবধি অচল থাকতে হতো। আজকাল আর এসব নেই। চোখে অস্ত্রোপচার করে কৃত্রিম লেন্স সংযোজন করা হয়। ফলে রোগী অস্ত্রোপচার সম্পন্নের দিন থেকেই দেখতে শুরু করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক দিনের মতো চোখ ঢেকে রাখা হয়, পরের দিন থেকেই দৃষ্টি লাভ! কৃত্রিম লেন্স সংযোজনের দরুন পুরোপুরি দৃষ্টিপ্রাপ্তি সম্ভব। অর্থাৎ তরুণ বয়সের দৃষ্টিশক্তির মতোই দৃষ্টিশক্তি পাওয়া যায়। হালিমা খাতুন এসব জেনেই এসেছেন ছানির অপারেশন করাতে।
হালিমা খাতুন যথারীতি হাসপাতালে ভর্তি হন। অপারেশনের আগের দিন তাঁর চোখের লেন্সের পাওয়ারের মাপ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে তিনি জেনেছেন, চোখে যে লেন্স সংযোজন করা হয় তা বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। লেন্সের প্রকারভেদে মূল্য ২০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। হালিমা বাড়ি থেকে যে টাকা নিয়ে এসেছেন, তাতে ১৫ হাজার টাকার লেন্স সংযোজন সম্ভব নয়। সাধারণভাবেই তাঁর ধারণা, ১৫ হাজার টাকার লেন্স নিশ্চয়ই ২০০ টাকার লেন্সের চেয়ে অনেক ভালো।
তাঁর মনে দ্বিধা জন্মায়। একবার ভাবেন এযাত্রায় অস্ত্রোপচার না করিয়ে বাড়ি গিয়ে ধারদেনা করে টাকা নিয়ে এসে ওই ১৫ হাজার টাকার লেন্সই চোখে লাগাবেন। আবার ভাবেন, বেতনের টাকার বাইরে তেমন তো তাঁর আয় নেই! ধার করা টাকা পরিশোধ করতে বেতনের টাকায় বেশ কমাস লাগবে। কাজেই প্রয়োজন কী? তিনি তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেন। চিকিৎসক জানান, চোখের ভেতর ঠিকমতো পৌঁছতে পারলে ১৫ হাজার টাকার লেন্স যা করবে, ২০০ টাকার লেন্স তা-ই করবে।
ওপরের ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে রোগীরা আধুনিক চিকিৎসালয়ে এসে এক ধরনের বিভ্রান্তির শিকার হন। লেন্সের মূল্যের তারতম্যে এ বিভ্রান্তি আসাটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ বিদেশি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জিনিসের প্রতি দুর্বল। যুক্তরাষ্ট্রের লেন্স নিশ্চয়ই ভারতের লেন্সের চেয়ে ভালো! কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের লেন্স লাগাবেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত অনেক সময় নিয়ে ফেলেন রোগীরা।
এ ক্ষেত্রে লেন্স সম্পর্কে রোগীদের মনে সৃষ্ট এ বিভ্রান্তি নিরসনে চিকিৎসকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরই দায়িত্ব হলো রোগীকে বুঝিয়ে বলা যে লেন্সের মূল্যের তারতম্য লেন্সের কার্যকারিতায় তেমন কোনো ভূমিকা পালন করে না। ২০০ টাকার ভারতীয় লেন্সের সঙ্গে দুই হাজার ২০০ টাকার যুক্তরাষ্ট্রের লেন্সের কার্যকারিতায় কোনো তফাত নেই। লেন্স সংযোজনে কোনো অসুবিধা না হলে উভয় ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের দৃষ্টিশক্তি লাভ করা যায়। তবে লেন্স পছন্দের ক্ষেত্রে রোগীর পছন্দের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা দরকার।
এবার আবার হালিমা খাতুনের প্রসঙ্গে আসি। হালিমা খাতুন চিকিৎসকের মন্তব্য শুনে কিছুটা আশঙ্কামুক্ত হন। তিনি তাঁর নিয়ে আসা টাকায়ই অস্ত্রোপচারের যাবতীয় খরচ নিষ্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। এর পরও তাঁর মনে একরকম খুঁত থাকে-নিশ্চয়ই ১৫ হাজার টাকার লেন্সটা হয়তো ভালো। তাঁর পাশের শয্যার ব্যবসায়ী সন্তানের মাকে ওই লেন্স লাগানো হবে। আবার তাঁর অদূরে এক পোশাকশ্রমিকের মায়ের চোখে লাগানো হবে ২০০ টাকার লেন্স।
একই দিনে তাঁদের সবার চোখে লেন্স সংযোজন হয়। একই সার্জন তা করেন। পরের দিন অস্ত্রোপচারকৃত সব রোগীর চক্ষু পরীক্ষার কক্ষে নিয়ে আসা হয়। তালিকা দেখিয়ে রোগীদের দৃষ্টি মাপা হয়। হালিমা দেখলেন তাঁর দৃষ্টি, তাঁর পাশের ব্যবসায়ীর মায়ের দৃষ্টি ও পোশাকশ্রমিকের মায়ের দৃষ্টিতে কোনো পার্থক্য নেই। অর্থাৎ ১৫ হাজার টাকা, দুই হাজার ২০০ টাকা, ২০০ টাকার লেন্সের কার্যকারিতা একই স্তরের।
এবার হালিমা খাতুনের মনে আর দ্বন্দ্ব নেই। তিনি ছুটির কাগজপত্র নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন। সঙ্গে নিয়ে যান কৃত্রিম লেন্স সম্পর্কে এক রকম ধারণা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর পরিচিত ছানি রোগীদের এ বার্তাটাই দেবেন যে লেন্সের কার্যকারিতায় দামের পার্থক্যের তেমন কোনো ভূমিকা নেই।

 

মো· শফিকুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

তথ্যসূত্র : prothom-alo. 

 

 
< আগে   পরে >
      
bnr.png