ভূমির জরিপ-সমস্যা এড়াতে করণীয়

বাংলাদেশে যেসব মামলা হয়, এর মধ্যে ভূমিবিষয়ক মামলার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। অনেকেই ভূমিসংক্রান্ত আইন না জানার কারণে নানা রকম জটিলতার সম্মুখীন হন। অথচ একটু সচেতন হলে খুব সহজেই তাঁরা ভূমিসংক্রান্ত সব সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারেন। আপনাদের সুবিধার্থে ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা এড়ানোর কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচে প্রদান করা হলোঃ
১· মাঠপর্যায়ে জরিপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আপনার নিজস্ব জমির সীমানা বা আইল নির্ধারণ করে সরকারি আমিনদের সঠিকভাবে দেখাবেন।
২· খানাপুরী স্তরে নিয়োজিত আমিনদের আপনার জমির পূর্বদাগ, খতিয়ান নম্বর, দলিলপত্র, অন্যান্য কাগজপত্র প্রদর্শন করবেন। খানাপুরী স্তরে নিয়োজিত আমিনেরা ১৫ দিনের মধ্যে মাঠের জরিপকাজ শেষ করবেন। তাই নিজ দায়িত্বে জরিপকাজ চলার সময় আপনার জমির সব সঠিক হিসাব তালিকাভুক্ত অবশ্যই করাবেন।
৩· বুঝারত স্তরে আপনাকে জমির পর্চা প্রদান করা হবে। পর্চায় আপনার নাম, ঠিকানা, জমির দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ সঠিক আছে কি না, তা মিলিয়ে নিন। মনে রাখবেন, বুঝারত স্তরে নিয়োজিত আমিনেরা এক সপ্তাহের মধ্যে সব কাজ শেষ করবেন।
৪· পর্চায় কোনো প্রকার ভুলভ্রান্তি হলে আপত্তি ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে দাখিল করবেন। আপত্তিসংক্রান্ত আবেদন পাওয়ার পর হল্কা কর্মকর্তা শুনানি করে এক সপ্তাহের মধ্যে আপনার সব সমস্যার সমাধান করবেন।
৫· তসদিক স্তরে খানাপুরী ও বুঝারত স্তরে প্রণীত আপনার খতিয়ান রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক তসদিককৃত (সত্যায়িত) করে নিন। এই স্তরে আপত্তি দাখিল করে তা তসদিক কর্মকর্তা কর্তৃক সংশোধন করে নিতে পারবেন। তসদিক কর্মকর্তা ছোট মৌজা এক মাসে এবং বড় মৌজা দুই মাসে তসদিক করবেন।
৬· তসদিকের কাজ সমাপ্তির পর খতিয়ান ৩০ দিন সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। এই পর্যায়ে জমির মালিকদের প্রথম অক্ষর অনুসারে খতিয়ানে একটি নতুন নম্বর প্রদান করা হয়, যা ডিপি নম্বর নামে পরিচিত।
৭· ডিপিসংক্রান্ত সব আপত্তি ৩০ দিনের মধ্যে ১০ টাকা কোর্ট ফি দিয়ে ৩০ বিধি অনুসারে আপত্তি-কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে। আপনার আপত্তির আবেদন পাওয়ার পর তা শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে।
৮· আপত্তির রায়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে ৩১ বিধি অনুসারে আপিল করতে হবে। মনে রাখবেন, আপিল স্তরই রেকর্ড প্রস্তুতের জন্য দেওয়া সর্বশেষ সুযোগ। আপত্তি রায় প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের না করলে আবেদনটি তামাদির কারণে অগ্রহণযোগ্য হবে।
৯· আপিল শুনানির পর নকশা ও রেকর্ড চূড়ান্ত হবে এবং মুদ্রণ করা হবে। চূড়ান্ত প্রকাশনাকালে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প অফিস থেকে প্রতিটি পর্চা ৬০ টাকা এবং নকশা ৩৫০ টাকা জমা দিয়ে সংগ্রহ করা যাবে।
এ ছাড়া ঢাকার সব খতিয়ান (মুদ্রিত) ৬০ টাকা, মৌজা ম্যাপ (ফটোকপি) ৩০০ টাকা, থানা ম্যাপ (মুদ্রিত) ৫০০ টাকা, জেলা ম্যাপ (মুদ্রিত) সাদা ৫০০ টাকা, জেলা ম্যাপ (মুদ্রিত) রঙিন ৭৫০ টাকা, বাংলাদেশ ম্যাপ (মুদ্রিত) ১২৫০ টাকা এবং মৌজা ম্যাপ (মুদ্রিত) ৩৫০ টাকার বিনিময়ে ভূমি জরিপ অফিস, ২৮ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণি (তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়), ঢাকা-১২০৮ থেকে সংগ্রহ করা যাবে। প্রতিটি পর্চা সংগ্রহের জন্য ১০ টাকার কোর্ট ফিসহ পৃথক আবেদনপত্র জমা দিতে হবে। এ ছাড়া xি·িফমফষৎং·মড়া·নফ ওয়েবসাইট থেকেও সব জেলার ভূমিবিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্যাদি এবং পর্চার আবেদনপত্র বিনামূল্যে পাওয়া যাবে।
১০· মৌজার রেকর্ড চূড়ান্ত প্রকাশনা গেজেটের পর কোনো আপত্তি থাকলে জজকোর্ট ভবনে অবস্থিত ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ২০০ টাকার কোর্ট ফি দিয়ে বা দেওয়ানি আদালতে প্রতিকার চেয়ে মামলা করতে হবে।
মনে রাখবেন, ভূমিবিষয়ক যেকোনো সমস্যায় আপনার জমির মূল দলিল, নামজারির কাগজ, খাজনার কাগজ, জাতীয় পরিচয়পত্র, সিএস/এসএ/আরএস পর্চা, বণ্টননামা, উত্তরাধিকার সনদপত্র যেকোনো সময় লাগতে পারে। তাই এ-বিষয়ক সব কাগজপত্র আগেই সংগ্রহ করে কয়েক কপি ফটোকপি করে রাখবেন। যদি ভূমিবিষয়ক কোনো কিছু বুঝতে বা কাগজপত্রাদি সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়েন, তাহলে যেকোনো আইনজীবীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করবেন।

 

লেখক : খন্দকার হাসান শাহ্‌রিয়ার, আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট।

তথ্যসূত্র : prothom-alo.