ভাড়ার মোটরসাইকেল: নতুন কমর্সংস্থান

বাংলাদেশের বেশকিছু অঞ্চলে মোটরসাইকেলে যাত্রীপরিবহন নতুন পেশা হিসেবে আবিভূর্ত হয়েছে।আপনার এলাকায় এই সুযোগ থাকলে আপনার জন্য তা আয়ের উৎস হতে পারে।এ সম্পর্কে দৈনিক প্রথম আলোতে একটি প্রতিবেবদন প্রকাশিত হয়েছে।

বরগুনার গোটা আমতলী উপজেলার ভেতরে-বাইরের রাস্তাগুলোয় মোটরসাইকেলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন একদল যুবক। কখনো জেলার গণ্ডি পেরিয়ে ছুটছেন অন্য জেলায়। তাতে কারও আপত্তি নেই, বরং সবাই খুশি। খুশি তাঁদের পরিবার-পরিজনও। কারণ এটা তাঁদের পেশা। দুজন যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে ছুটে যাওয়া তাঁদের জীবিকা। এই জীবিকাকে বলে ‘ভাড়ার মোটরসাইকেল’।
বরগুনার আমতলীতে এই ‘ভাড়ার মোটরসাইকেল’ যাত্রী পরিবহনে খুব দ্রুত শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে; বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর এই পরিবহনটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যাত্রী ধারণক্ষমতা কম হলেও এর দ্রুতগতি আর সহনশীল ভাড়া যাত্রীদের দ্রুত আকৃষ্ট করেছে।
বছরখানেক আগেও এই যুবকেরা পরিবারের বোঝা হয়েছিলেন। ‘বাপে খেদানো, মায়ে তাড়ানো’ ছেলের মতো অবস্থা ছিল তাঁদের। আজ তাঁদের অনেকেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। শুধু মোটরসাইকেল চালিয়ে উপার্জিত আয় এঁদের করেছে স্বাবলম্বী। বেকার যুবকদের জন্য তাঁরা পরিণত হয়েছেন আয়ের পথপ্রদর্শকে।

এই পথপ্রদর্শকদের একজন ‘মাস্টার লিটন’। এইচএসসি পাস করায় তাঁর এ উপাধি জুটেছে। লিটন (৩৫) বলেন, ‘তিন বছর আগেও আমি বেকার ঘুরে বেড়াতাম। কিছুদিন বন্ধুদের সঙ্গে ব্যবসা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সুবিধা করতে পারিনি। পরে ভাবতে ভাবতে একদিন মাথায় আসে মোটরসাইকেলের কথা। কারণ, কুয়াকাটায় দেখেছি মোটরসাইকেলে করে যাত্রী পরিবহন করতে। পরে মোটরসাইকেল নিয়ে নেমে পড়লাম এ পেশায়।’ লিটন অকপটে বলেন, ‘প্রথম প্রথম লজ্জা করত। কিন্তু রোজগার বাড়তে থাকায় লজ্জা আপনিতেই কেটে যায়।’ লিটন জানান, খরচাপাতি বাদ দিয়ে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হতো। সেই থেকে এটাই পেশা হয়ে দাঁড়ায়। লিটন এখন দুটো মোটরসাইকেলের মালিক। চালক রেখে মোটরসাইকেল ভাড়া খাটাচ্ছেন তিনি।
এলাকা ঘুরে জানা গেছে, গোটা উপজেলায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের ৩০টির মতো স্ট্যান্ড রয়েছে। এগুলোর মধ্যে এ কে স্কুল, নতুন বাজার, হলদিয়া অফিস, তালুকদার বাজার, সাহেববাড়ি, গাজীপুর, শাখারিয়া, মহিষকাটা, আড়পাঙ্গাসিয়া, কড়ইবাড়িয়া, কচুপাত্রা, বগী, তালতলী, ফকিরহাট ও নিউ পাড়া স্ট্যান্ডে যাত্রীসমাগম বেশি। দিনরাত প্রায় ২৪ ঘণ্টাই ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাওয়া যায়।
চালকেরা জানান, সিডরের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনকাজে সংশ্লিষ্ট সব শ্রেণীর মানুষ ব্যাপক হারে ‘ভাড়ার মোটরসাইকেল’ ব্যবহার করেছেন। তখন থেকে এর ব্যবহার আরও বেড়ে গেছে। বেড়েছে চালকের সংখ্যাও। তাঁদের কাছ থেকে জানা যায়, আমতলী উপজেলা শহর থেকে তালতলী, পটুয়াখালী, কলাপাড়া, গলাচিপা, বরগুনা, কুয়াকাটাসহ আমতলীর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে ৫০০-এর মতো ভাড়ায় চালিত এই দ্বিচক্রযানে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ বিভিন্ন স্থানে চলাচল করছে।
নতুন বাজার স্ট্যান্ডের চালক জগন্নাথ (৩০) বলেন, ‘এত দিন যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন ব্যবসায়ী। ইদানীং চাকরিজীবী, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রী, সরকারি দপ্তরের লোকজন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মোটরসাইকেলের যাত্রী হওয়া শুরু করেছেন।’ পাতাকাটা গ্রামের চালক নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘মানুষের এখন সময় কম। বাস-টেম্পুর অপেক্ষা করে না। গাড়িতে গাদাগাদি করে যাওয়ার চাইতে আমাগো সঙ্গে ভিআইপির মতোন যায়।’ তিনি জানান, প্রতিদিন মোটরসাইকেলের মালিককে ১৭০ টাকা দিতে হয়। তেল খরচ যায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। তার পরও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা লাভ থাকে।
পাঁচ কিলোমিটার দূরের ঘটখালী গ্রাম থেকে প্রতিদিন সকালে আমতলী শহরের বড় বাজারে মাছ-তরকারি কিনতে আসেন জাহিদ হোসেন (৪০)। তিনি বলেন, গ্রামে থেকে প্রতিদিনের বাজার-সদাই করা খুবই অসুবিধা। তবে এখন ‘ভাড়ার মোটরসাইকেল’ চালু হওয়ায় গ্রাম ও শহরের দূরত্ব কমে গেছে। তাছাড়া আগে রিকশাভ্যানে চলাচল করতে ভাড়া আর সময় দুই-ই বেশি লাগত।
মোটরসাইকেল চালিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে সংসারের পুরো দায়িত্ব নিয়েছেন আমতলী পৌর শহরের রিপন তালুকদার। বাবার মৃত্যুর পর ধার-দেনা করে একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কিনে এ পেশায় নেমে পড়েন তিনি। রিপন বলেন, ‘প্রতিদিন ভোর রাতে পৌঁছে যাই বাসস্ট্যান্ডে। বিভিন্ন রুটের নৈশকোচের যাত্রীদের পরিবহনের মধ্য দিয়ে দিনের কাজ শুরু করি। থাকি গভীর রাত পর্যন্ত।’ রিপনের ভাষায়, ‘এখনই তো খাটুনির বয়স। এ বয়সে পয়সা না জমালে বুড়ো বয়সে চলমু কেমনে।’
এ পেশায় এসে অবস্থার মোড় ঘোরানো আরেক চালক উপজেলার চন্দ্রা গ্রামের আলমগীর হোসেন। দরিদ্র কৃষক পিতার সংসারে তিনবেলা পেট পুরে খাবার জোটানোই একসময় মুশকিল ছিল তাঁর। তিন বছরের পরিশ্রমে আলমগীরের পরিবার এখন সচ্ছল। গত বছর তিনি পরিবারের সব দেনা শোধ করে প্রায় পাঁচ বিঘার মতো জমি কিনেছেন। বাড়িতে তুলেছেন বড় টিনের ঘর, যা এলাকার কারও মনে ঈর্ষা জাগায়, আবার কারও জোগায় অনুপ্রেরণা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমতলী থানার পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে নানা কাজে দূরে যেতে হয়। থানার দু-একজন কর্মকর্তার নিজস্ব মোটরসাইকেল আছে, তার পরও আমাদের ভরসা এই ভাড়ার মোটরসাইকেল।’ আমতলীর আঠারগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল আজিজ মিয়া পরিবার নিয়ে বাস করেন আমতলী শহরে। সপ্তাহে পাঁচ দিনই ১৫ কিলোমিটার দূরে তিনি অফিস করেন ভাড়ার মোটরসাইকেলে চড়ে।’
তবে আমতলীর ঠিকাদার আবু সায়েম বলেন, ‘আমি নিজের মোটরসাইকেলেই যাতায়াত করি। কিন্তু ইদানীং সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। রাস্তায় মাঝেমধ্যেই লোকজন হাত তুলে মোটরসাইকেল থামিয়ে জিজ্ঞেস করে-এই, ভাড়া যাবে?’
ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি মিজানুর রহমানও এ সমস্যার কথা তুলে বলেন, ‘যারা মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালান, তাঁদের নির্দিষ্ট পোশাক থাকা উচিত। তাহলে অন্য চালকদের আর এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না।’
আমতলী এ কে স্কুল মোড়ের মোটরসাইকেল পরিবহন সমিতির সভাপতি বাবুল মিয়া (৩৬) বলেন, ‘আমরা আমাদের চালকদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের চিন্তাভাবনা করছি। সাধারণ পোশাকের ওপর কটি ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাব রয়েছে।
আলাপকালে আমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আয়ুবুর রহমান বলেন, ‘বেকার যুবকেরা কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছেন। এ কাজে তাঁদের সহযোগিতা করা দরকার। আমি মোটরসাইকেল-চালকদের মধ্য থেকে কমিউনিটি পুলিশের জন্য বাছাই করে লোক অন্তর্ভুক্ত করছি। এতে পুলিশের যেমন কাজ চালাতে সুবিধা হবে, তেমনি তাঁরাও উপকৃত হবেন।’
আমতলীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু নইম মোহাম্মদ আব্দুছ ছবুর বলেন, মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন, ইন্স্যুরেন্স, হেলমেট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স যথাযথভাবে না পাওয়া গেলে সাধারণত জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া অপেশাদার রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের অধীনে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন আইনত অপরাধ। তবে যেসব মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করা হয়, সেগুলোকে পেশাদার লাইসেন্সের আওতায় আনার পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া, তিনি বলেন, প্রত্যেক চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা খুবই দরকার। চালক-যাত্রী উভয়কেই হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। এতে শুধু আইনই মানা হবে না, আরোহীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
এ কে এম খায়রুল বাশার বুলবুল, আমতলী (বরগুনা)
শনিবারের বিশেষ প্রতিবেদন
প্রথম আলো, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৮