নারী ও নকশা

cover_small.jpgবৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর ও শেরপুরসহ আরও কয়েকটি জেলার গ্রাম ও শহরের অধিকাংশ মহিলা সূচীকর্মে পারদর্শী৷ সুঁই-সুতার মাধ্যমে কাপড়ের উপরে তাঁরা ফুটিয়ে তোলেন নিখুঁত নকশা৷ দারিদ্রতার কারণে অক্ষর-জ্ঞানশূন্য হয়েও সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতায় এরা ব্যপক অবদান রাখছেন৷ এই অঞ্চলের প্রায় ৪০টি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র৷ 

এখানে প্রতিটি গ্রামেই একাধিক মহিলা প্রতিনিধি আছেন৷ নিজেরা সেলাইয়ের কাজ করার পাশাপাশি এই প্রতিনিধিরা এলাকার অন্য মহিলাদের করা নকশার কাজগুলো শহরের শোরুমে নিয়ে আসেন এবং সেখান থেকে আবার সবার জন্য নতুন কাজের অর্ডার নিয়ে যান গ্রামে৷ এই শোরুমগুলোর মালিকও অধিকাংশই মহিলা৷ এরাই আবার স্থানীয় ক্রেতাদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোর ক্রেতা বা শোরুমগুলোতে প্রতিনিধিদের সংগ্রহ করে আনা কাজগুলো বিক্রি করেন৷ এভাবেই চলছে অর্থনৈতিকক্ষেত্রে এই এলাকার মেয়েদের সক্রিয় অংশগ্রহণ৷

যেহেতু দারিদ্রতার কারণে এদের একটি বড় অংশ অক্ষর-জ্ঞানবঞ্চিত, তাই এদেরকে অক্ষর-জ্ঞানসম্পন্ন করে তোলার জন্য তাদের কাজের সাথে সম্পর্ক রেখে "নারী ও নকশা" সিডিটি তৈরী করা হয়েছে৷ প্রতিটি অধ্যায়ে গল্প ও ছবির মাধ্যমে এদের দৈনন্দিন কাজ, জীবনযাপন, সমস্যা, সংগ্রাম এবং অর্থনৈতিকক্ষেত্রে এদের অবদান সবই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে৷

এই সিডিটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গবেষনা করার পর সেখানকার মানুষের জীবনের সত্যিকার কাহিনী, তাদের জীবন যাত্রা, তাদের ব্যবহারকৃত আঞ্চলিক শব্দসমূহ ব্যবহার করে অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদেরই উপযুক্ত করে প্রতি অধ্যায়ের পাঠগুলো তৈরী করা হয়েছে এবং এই সিডিতে উপস্থাপিত চরিত্রগুলিও স্থানীয়৷ ইউনেস্কোর আর্থিক এই শিক্ষা উপকরণ তৈরী করেছে ডি.নেট (ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ নেটওয়ার্ক)৷ এই এলাকার নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে সিডিটির একটি বইয়ের সংস্করণও তৈরী করা হয়েছে৷ লেখা শেখানোর জন্য সঙ্গে রাখা হয়েছে 'আমি লিখতে পারি' নামের আর একটি লেখার ম্যানুয়াল৷ কম্পিউটারকে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাথেও তারা পরিচিত হবেন৷

সারা বাংলাদেশে পল্লীতথ্য কেন্দ্র (টেলিসেন্টার), পাঠাগার, এনজিও পরিচালিত স্কুল ও অন্যান্য উপযুক্ত স্থানে, যেখানে কম্পিউটার আছে, সেখানে এই শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে নারী ও কিশোরীদের সাক্ষরতা প্রদান সম্ভব। সিডির জন্য যোগাযোগ করুন: আশরাফ আবির, এমসিসি, ০১৭১৬৪৮৪৮৪২।

এই সিডি ও বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা 

  • বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণগুলোর সাথে পরিচিত হবে৷ 
  • সংখ্যা চিনতে ও লিখতে পারবে৷ 
  • তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত বেশকিছু শব্দের ব্যবহার জানতে পারবে৷ 
  • নতুন ডিজাইন ও সেলাইয়ের সাথে পরিচিত হবে৷ 
  • প্রাত্যহিক জীবনের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে৷ 
  • সর্বপরি কাজের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং লেখাপড়া শেখার প্রতি আগ্রহী হবে৷


সিডির সূচিপত্র:

  • স্বরবর্ণ পরিচিতি 
  • ব্যঞ্জনবর্ণ পরিচিতি
  • স্বরবর্ণ লেখা 
  • ব্যঞ্জনবর্ণ লেখা 
  • সংখ্যা লেখা

অধ্যায়/গল্প:

  • হাসনা বানুর কথা
  • হাসনা বানুর সাফল্য
  • রুবেলের অসুখ
  • রুপালীর স্বপ্ন
  • আমাদের শেফালী
  • তসলিমার সাফল্য
  • শাহনাজ হুসেন
  • ফুলির সংসার
  • সেলাই কোন কঠিন কাজ নয়
  • নানারকম সেলাই
  • বর্ণ ও শব্দ উচ্চারণ 
  • বর্ণ ও শব্দ পরিচিতি

নমুনা
প্রথম অধ্যায়
হাসনা বানুর গল্প:
উদ্দেশ্য 

এই অধ্যায় শেষে শিক্ষার্থীরা-
- ক, স, ন, র, ম এবং ট বর্ণের সাথে পরিচিত হবে৷
- কয়েকটি সংখ্যার সাথে পরিচিত হবে৷
- কয়েকটি সেলাইয়ের নাম ও নমুনা জানতে পারবে৷
- কাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে৷

এনিমেটেড গল্প

আমি হাসনা বানু আমাদের গ্রামের নাম ঘোষপাড়া৷আমাদের গ্রামটা অনেক সুন্দর৷ গ্রামের পাশেই একটা নদী আছে, ব্রক্ষ্মপুত্র৷ আমার বিয়ে হয়েছে আজ থেকে চার বছর আগে৷ বিয়ের পর আামি এই গ্রামে আসি৷ আমার স্বামী কাঠমিস্ত্রি৷ সে শহরে একটাদোকানে কাজ করে৷ সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে৷ আমার একটা বাচ্চা আছে৷ দুই বছর বয়স৷ আমি যখন এই গ্রামে আসি দেখি গ্রামের অনেক মেয়েই সেলাইয়ের কাজ করে৷ মরিয়ম আপা শহর থেকে কাজ নিয়ে আসে, তারপর সবাইকে দেয়৷ কাজদেয়ার সময় সবাইকে সময় বলে দেয়৷ যেমন সালোয়ার-কামিজ সেলাই করতে ৭ দিন, শাড়ি সেলাই করতে ১৫ দিন, আবার কাঁথা সেলাই করতে ২ মাস লাগে৷ ফতুয়া, শার্ট, দেয়ালে টাঙ্গানোর জন্য নানারকম নকশা করা কাপড়ও থাকে৷আমি ছোটবেলা থেকেই নানারকম সেলাই জানতাম৷তাই একদিন মরিয়ম আপাকে বললাম আমিও সেলাই করতে চাই৷ আপা প্রথমে আমাকে একটি ফতুয়া সেলাই করতে দিল৷ নতুন কাপড়ের উপরে আগে থেকেই নকশার ছাপ দেয়া ছিলো৷ আমি ১১ দিন ধরে নকশাটা ফতুয়ায় তুললাম৷ সুঁই-সুতা সবই মরিয়ম আপা দিয়েছিল৷ আপা আমার কাজ দেখে খুশীই হলো৷ আমাকে মজুরি বাবদ ৮০ টাকা দিল৷ এখন আমি আগের চেয়ে ভাল সেলাই করতে পারি৷ ৩ বছর ধরে সেলাই করছি, কিন্তু মাঝে আমার ছেলেটা হলো সেইজন্য আগের মতো তাড়াতাড়ি কাজ করতে পারি না৷ সারাদিন সংসার করে সেলাইয়ের কাজ করতে হয়৷ সকালবেলা স্বামী কাজে যায়৷ সবার জন্য নাস্তা বানাই৷ আমার শ্বশুর মারা গিয়েছে অনেক আগে৷ শ্বাশুড়ি আছে, তার দেখাশোনা করতে হয়৷ ছেলেটা ছোট,তাকে আদর যত্ন করতে হয়৷ রান্না করতে হয়৷সেলাই করে যা পাই তা কিছু সংসারে দেই, ছেলের জন্য খরচ করি, নিজের কাপড়-জামা কিনি৷ এখন আমার স্বামীর জন্য একটা পাঞ্জাবী সেলাই করছি৷ সারাদিন সংসারের কাজ করার পর দুপুরে ছেলেটাকে গান গাইতে গাইতে ঘুম পাড়াই৷ আমাদের গ্রামে বিদু্যত্‍ নাই৷ তাই রাতে আমি তেমন কাজ করতে পারি না৷ আমার খুব ভাল লাগে আমার শ্রম সংসারের স্বচ্ছলতা অর্জনে কাজে লাগে৷ আমার স্বপ্ন- সেলাই থেকে আমার করা আয়ে টিনের ঘরটা পাকা করবো, ছেলেটাকে স্কুলে পড়াব৷ ঘরে একটা টেলিভিশন কিনবো, সিনেমা দেখবো৷